মধ্যপ্রাচ্যের অবরুদ্ধ জনপদ গাজায় কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কেবলই এক প্রহসনে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গাজায় বর্তমানে প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে একজন ফিলিস্তিনি হতাহতের শিকার হচ্ছেন। তথাকথিত যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর অব্যাহত বোমা হামলা, বিমান ও স্থল আগ্রাসনে উপত্যকাটি মৃত্যুপুরীতে রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার বরাত দিয়ে আল জাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ইসলামিক রিলিফ প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত এক বছরে গাজায় ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ১ হাজার ৪৫৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। মর্মান্তিক বিষয় হলো, নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩২০ জনই নিষ্পাপ শিশু; অর্থাৎ যুদ্ধবিরতির পরও প্রতিদিন গড়ে একটি করে শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। অন্যদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ঘোষণা আসার পর থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৭১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ১৮৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে কেবল গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানেই নতুন করে ৪ জন নিহত এবং ২৮ জন আহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি বর্বরতায় গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ২৫৪ ছাড়িয়েছে।
মাঠপর্যায়ে ইসরাইলি আগ্রাসনের নৃশংসতা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ফিলিস্তিনি বার্তাসংস্থা ওয়াফার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবারও মধ্য গাজায় ইসরাইলি বাহিনী এক ফিলিস্তিনিকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছে। এছাড়া মধ্য খান ইউনিসের একটি আবাসিক বাড়িতে চালানো ইসরাইলি বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন শহরে চলমান ইসরাইলি সামরিক অভিযানের সময় ত্রয়োদশ এক কিশোরের পায়ে সরাসরি গুলি লেগেছে।
মানবিক সংকটের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে ইসলামিক রিলিফের অপর এক তথ্যে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ (ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকা নির্দেশক রেখা) ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের গাজার ৬৫ শতাংশ এলাকা থেকে উচ্ছেদ করেছে। এর ফলে প্রায় ২১ লাখ মানুষ উপত্যকার অবশিষ্ট মাত্র ৩৫ শতাংশ এলাকায় চরম মানবেতর পরিস্থিতিতে গাদাগাদি করে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। গাজায় কর্মরত ইসলামিক রিলিফের এক ত্রাণকর্মী বর্তমান পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘বাস্তবে এখানে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই। দখলদার বাহিনী প্রতিনিয়ত বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু ও জনাকীর্ণ এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, ফলে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।’
পাশাপাশি, অবরুদ্ধ এই এলাকায় ত্রাণ প্রবেশে কঠোর বাধা বজায় রেখেছে ইসরাইল। আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী, জেনারেটরের জ্বালানি ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম গাজায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ অবকাঠামো আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, অর্ধেকেরও বেশি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি না পাওয়ায় ২০ হাজারেরও বেশি গুরুতর অসুস্থ রোগী মৃত্যুর মুখে দিন কাটাচ্ছেন। এমন অবস্থায় বিশ্বনেতাদের তীব্র সমালোচনা করে ইসলামিক রিলিফ অবিলম্বে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়নে জোরালো চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির সাফ কথা, ‘কাগজে-কলমে নামমাত্র যুদ্ধবিরতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা বা দায়মুক্তির কোনো অজুহাত হতে পারে না।’